ভারত-বাংলাদেশের সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সম্পাদিকা, ঔপন্যাসিক, কণ্ঠশিল্পী ও ছড়াকার মাধুরী ব্যানার্জীর অণুগল্প “একটি মেয়ের মা হওয়ার গল্প”
একটি মেয়ের মা হওয়ার গল্প
-মাধুরী ব্যানার্জী
তৃণা ছোটবেলা থেকেই মা নেউটে ছিল। মা এর সঙ্গে হাতে হাতে কাজ, পড়াশোনা, গান বাজনা এসব করে দিন কাটতো তার। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে কিম্বা অসুস্থতায় মা এর উৎকণ্ঠার অন্ত ছিলনা। কিছু বললেই মা বলতো”একদিন তুইও কারও মা হবি।” তখন সে বুঝত না, মা হওয়া শুধু একটি সম্পর্ক নয়—এ এক দীর্ঘ যাত্রা।
সময় গড়াল। পড়াশোনা শেষ করে সংসার শুরু করল তৃণা। নতুন জীবনে পদার্পণের কিছু দিনের মধ্যেই চিকিৎসকের মুখে শোনা গেল সুখবর। সেই দিন থেকেই তার জীবন বদলে গেল। নিজের পছন্দের খাবারের চেয়ে সে ভাবতে লাগল গর্ভের ছোট্ট প্রাণটির কথা। রাত জেগে গল্পের বই পড়ত, মিষ্টি সুরে গান গাইত, যেন অনাগত সন্তান সব শুনতে পায়।
মাসের পর মাস কেটে গেল। শরীরের কষ্ট বাড়ল, কিন্তু মায়ের হৃদয়ে জন্ম নিল এক অদ্ভুত শক্তি। প্রতিটি লাথি, প্রতিটি নড়াচড়া তাকে মনে করিয়ে দিত—তার ভেতরে একটি নতুন পৃথিবী বেড়ে উঠছে।
অবশেষে এল সেই প্রতীক্ষিত দিন। আকাশে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। বাড়ির আত্মীয়-স্বজন দের উদ্বিগ্নতা।দীর্ঘ যন্ত্রণার পর নার্সিং হোম এর বেডে ভেসে উঠল এক নবজাতকের কান্না। নার্স শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে তৃণাকে দেখাল । সন্তান কে দেখে তৃণার আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগলো।সব যন্ত্রণা যেন নিমেষেই দূর হয়ে গেল।সে স্তব্ধ হয়ে গেল। এতদিন যার জন্য অপেক্ষা, সে আজ তার বুকের ওপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তৃণা বুঝল, মা হওয়া মানে শুধু জন্ম দেওয়া নয়। মা হওয়া মানে নিজের ঘুম, নিজের স্বপ্ন, নিজের ক্লান্তি—সবকিছু হাসিমুখে সন্তানের ভবিষ্যতের কাছে সমর্পণ করা। সন্তানের প্রথম হাসি, প্রথম হাঁটা, প্রথম “মা” ডাক—প্রতিটি মুহূর্তে সে যেন নতুন করে জন্ম নিল।
সেদিন রাতে শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে তৃণা জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। তার মনে হলো, আজ সে শুধু একটি মেয়ে নয়, শুধু একজন স্ত্রীও নয়—আজ সে একজন মা। আর এই পরিচয়ই তার জীবনের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে আলোকিত গল্প।
মাতৃত্বের শুরু হয় একটি সন্তানের জন্মের মাধ্যমে, কিন্তু একজন নারীর মা হয়ে ওঠার গল্প লেখা হয় ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য আর সীমাহীন মমতা দিয়ে।