শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৩ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
চৌহালীতে স্থায়ী বাঁধের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত মাদক কারবারি চাঁদাবাজের কব্জায় গঙ্গানন্দপুর ইউপির আটুলিয়া গ্রাম জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও নদী রক্ষা আদালত সুযোগে ধাপে ধাপে জ্বালানির দাম কমানো হবে: প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দীর্ঘদিন পলাতক থেকেও শেষ রক্ষা হলো না ১৪ (চৌদ্দ) বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামী জহিরুলের, অবশেষে র‍্যাব-৮ কর্তৃক গ্রেফতার পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার চাঞ্চল্যকর ইউসুফ হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত আরাফাত র‍্যাব-৮ কর্তৃক গ্রেফতার চৌদ্দগ্রামে আব্দুর রহমান ভূঁইয়া, জাহেরা খাতুন ও হাসিনা বেগমের মাগফিরাত কামনায় সেলাই মেশিন বিতরন। মধ্যনগরে সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভা চাটখিলে ৩ সন্তান রেখে মসজিদের মুয়াজ্জিনের সাথে কানাডা প্রবাসীর স্ত্রী উধাও, থানায় অভিযোগ উদ্ভাবকদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের উদ্যোগ নেওয়া হবে: ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও নদী রক্ষা আদালত

শফিকুল ইসলাম খোকন : নদী শব্দটি শুনলেই প্রাচীন সময়ের কথা মনে পড়ে। নদীর কথা শুনলেই শৈশব ও কৈশোরের অসংখ্য স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নদীর কথা উঠলেই মনে পড়ে আমাদের প্রিয় নদীমাতৃক বাংলাদেশের কথা।
নদী প্রসঙ্গে বারবার ‘মনে পড়ে’ কথাটি বলছি কেন—এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসতে পারে। কারণ আমরা সাধারণত অতীতের ঘটনা, কর্মকাণ্ড ও অভিজ্ঞতার কথাই স্মরণ করি; অর্থাৎ যা ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের অনেক নদীও যেন ধীরে ধীরে ইতিহাসের অংশে পরিণত হচ্ছে। একসময় যে নদীগুলো মানুষের জীবন, জীবিকা, যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, তার অনেকগুলোই আজ হারিয়ে গেছে অথবা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। দখল, দূষণ, ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণশক্তি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। তাই নদীর কথা উঠলেই বারবার স্মৃতির পাতায় ফিরে যেতে হয়।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ আজ দেশের অধিকাংশ নদী দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার শিকার। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, নাব্যতা হারাচ্ছে, সংকুচিত হচ্ছে নদীর পরিসর। ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বেড়ে চলেছে।
বাংলাদেশের নদীগুলো আজ এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে নদীগুলো দেশের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবহন ও সংস্কৃতির প্রাণশক্তি ছিল, আজ তার অনেকগুলোই দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার শিকার। রাজধানীর চারপাশের নদী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট-বড় নদীগুলো পর্যন্ত একই সমস্যায় আক্রান্ত। এমন বাস্তবতায় নদী রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবং নদী-সংক্রান্ত বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দেশে নদী রক্ষার জন্য আইন রয়েছে, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। এত কিছুর পরও কেন নদী সুরক্ষিত হচ্ছে না? বাস্তবতা হলো, নদী দখল ও দূষণ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো আবার ফিরে আসে। নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ নদীর অস্তিত্বকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
গত এক বা দুই দশকে নদী রক্ষার প্রশ্নে সচেতনতা বেড়েছে। নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিচারিক সিদ্ধান্ত, অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযান জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনো খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। উচ্ছেদের পর অনেক স্থানে পুনরায় দখল হয়েছে, শিল্পবর্জ্য ও পলিথিন দূষণ অব্যাহত রয়েছে এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের দুর্বলতা প্রায়ই দৃশ্যমান হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এত কিছুর পরও কেন নদী সুরক্ষা পায় না? এর উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন আন্তরিকতা, দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। কমিশন বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ ও প্রতিবেদন দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন সবসময় নিশ্চিত হয় না। কারণ কমিশনের তদারকি ও পরামর্শমূলক ক্ষমতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতার অভাব রয়েছে। ফলে নদী রক্ষার উদ্যোগগুলো কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর বিচার অত্যন্ত জরুরি। আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হলে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়। অনেক সময় মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা নদী রক্ষার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দেয়। তাই নদী-সংক্রান্ত অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি নদীকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখব, নাকি টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করব? নদী ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা বর্জ্য ফেলে জলপ্রবাহ নষ্ট করা স্বল্পমেয়াদে লাভজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হয় বন্যা, জলাবদ্ধতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে।
নদী রক্ষার দায়িত্ব কেবল কমিশন বা আদালতের নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে কার্যকর করতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে নদীগুলোকে পুনরুদ্ধারের পথ আরও সুগম হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, কৃষি বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। তাই নদী রক্ষা কমিশন ও আদালতের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; এটি জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষারও প্রশ্ন।
একটু পেছনের দিকে তাকাতে হয়। বাংলাদেশকে বলা হয়ে থাকে নদীমাতৃক দেশ। অথচ নদীর বিষয়েই সবচেয়ে বেশি উদাসীনতা দেখা যায়। দেশের নদীগুলো রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে খসড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০২০ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সেই খসড়া আলোর মুখ দেখেনি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বর্তমান কমিশনের নদীদূষণ ও দখল রোধে সরকারকে সুপারিশ করা ছাড়া কার্যকর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না। পরে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামে নতুন খসড়া প্রণয়ন করেছে সরকার। প্রশ্ন ওঠে—এবারও কি তা আলোর মুখ দেখবে? নদী রক্ষা কমিশন কি স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবে?
তবে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রস্তাবিত হওয়ায় আমরা আগের মতো পুরোপুরি আশাহত নই। এবারও আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করছি—নদী রক্ষার জন্য একটি কার্যকর, শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং দেশের নদীগুলো নতুন জীবন ফিরে পাবে।

কি আছে খসড়া আইনে
‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ নদী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রচলিত আইন সংশোধনের মাধ্যমে দেশের নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮-এর অধীনে একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনও অনুরূপ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় ‘নদী রক্ষা আদালত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
খসড়া আইনে কমিশনকে নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলের দখল ও দূষণ প্রতিরোধ এবং এসব জলাশয়ের উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কমিশনের নির্দেশনা মানতে বাধ্য থাকবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কমিশনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
বর্তমান আইনে কমিশনের সরাসরি কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই; তারা কেবল সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এসব সুপারিশের অনেকগুলোই প্রশাসনিক স্তরে হারিয়ে যায় কিংবা বাস্তবায়িত হয় না। ফলে নদী রক্ষায় কমিশনের কার্যকর ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে। নতুন খসড়ায় কমিশনকে একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরাসরি তদন্ত, অভিযান পরিচালনা এবং আদালতে মামলা দায়েরের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের সব নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ (Legal Person), ‘আইনি সত্তা’ (Legal Entity) এবং ‘জীবন্ত সত্তা’ (Living Entity) হিসেবে বিশেষ আইনগত মর্যাদা প্রদান। যদিও এর আগে উচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছিলেন।
এ ছাড়া দেশের সব নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে পাবলিক ট্রাস্ট মতবাদ (Public Trust Doctrine)-এর আওতায় ‘পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে এসব সম্পদের মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগুলোকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।
খসড়া আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, কোম্পানি বা শিল্পকারখানা নদী, খাল কিংবা সমুদ্র উপকূলের তীরভূমি ও ফোরশোর এলাকায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করলে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকবে।
একইভাবে নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল দূষণ, কিংবা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের অপরাধেও একই ধরনের শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অপরাধের বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত ‘নদী রক্ষা আদালত’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
তবে আইন কার্যকর হওয়ার পরও যতদিন পর্যন্ত নদী আদালত প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন প্রচলিত আদালতেই নদী-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার চলবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিশেষ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যানদের অভিমত অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এ সংশোধনী আইন বাস্তবায়িত হলে দেশের নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল রক্ষায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে, যা দীর্ঘদিনের দখল ও দূষণ সমস্যার মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নদী রক্ষা আদালতের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও আজ দেশের অসংখ্য নদী অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। প্রভাবশালী মহলের দখল, শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক নদী তাদের স্বাভাবিক গতিপথ ও নাব্যতা হারাচ্ছে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর অধীনে নদী-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার হলেও মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিশেষায়িত নজরদারির অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। তাই নদী রক্ষায় বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র নদী আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলে বিচারিক প্রক্রিয়া আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে নদীকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দেশে নদী রক্ষার জন্য আইন রয়েছে, একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এমনকি আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নদী দখল, ভরাট ও দূষণ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো আবার ফিরে আসে। নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ নদীর অস্তিত্বকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আইনি ভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কমিশন নদী দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন, নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ প্রদানের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সময় প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।
নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আইন লঙ্ঘনকারীরা যদি দ্রুত শাস্তির আওতায় না আসে, তবে আইনের ভয়ও তৈরি হয় না। এ কারণে নদী-সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। বিচারিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে নদী রক্ষার আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। উন্নয়নের নামে নদী ধ্বংস করা হলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকেই দিতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে নদী রক্ষা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
দেশে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত আদালত রয়েছে—শ্রম আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, অর্থঋণ আদালত, পারিবারিক আদালতসহ নানা বিচারিক কাঠামো। যদিও ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ সবচেয়ে বেশি, তবুও আলাদা ভূমি আদালত না থাকলেও জেলা পর্যায়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ ধরনের মামলার বিচার করে থাকে। একইভাবে নদী-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রেও একটি বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলে বিচারিক কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে।
নদী দখল, দূষণ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং অন্যান্য পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য ‘নদী রক্ষা আদালত’-এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এই আদালত থাকলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। ফলে নদী দখল ও দূষণের প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং আইনের শাসন আরও সুসংহত হবে।

আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একটি দেশে যত উন্নত আইনই প্রণয়ন করা হোক না কেন, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আন্তরিকতা ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি অপরিহার্য। রাজনৈতিক সদিচ্ছা বলতে বোঝায় রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের এমন মানসিকতা ও উদ্যোগ, যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।
আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে যে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এবং তাদের সহযোগিতায় অনেক ব্যক্তি নদী দখল, দূষণসহ নানা ধরনের অপরাধ করে থাকে। এ প্রচলন বহু বছর ধরে চলে আসছে। যার ফলে আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখা দিলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইন লঙ্ঘন করলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, অথচ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায় এবং সমাজে বৈষম্য ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায় এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার গুরুত্ব অপরিসীম। যখন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে এবং দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনে, তখন সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়।
তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে প্রয়োজন স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সুশাসনসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক শর্ত। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার মাধ্যমেই আইনের শাসন সুদৃঢ় হবে এবং নাগরিকদের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে নদী রক্ষা নিশ্চিত হবে, নদী আদালতের কার্যক্রম ও রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং অপরাধীরা তাদের অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি পাবে। সর্বোপরি, আমাদের ঐতিহ্যবাহী নদীমাতৃক দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

লেখক: শফিকুল ইসলাম খোকন, সাংবাদিক, কলামলেখক ও গবেষক
সংর.শযড়শড়হঢ়@মসধরষ.পড়স।লেখক: শফিকুল ইসলাম খোকন, বাংলাদেশের উপকূলের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি উপকূল অঞ্চলের মানুষ, প্রকৃতি ও পেশাজীবিদের অধিকার এবং সুরক্ষা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।



ফেসবুকে আমরা
নোটিশ