মো : ফয়জুল ইসলাম লিমন : বাংলাদেশের কর্পোরেট ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ সম্পদ লুটের অভিযোগ উঠেছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী নাসা গ্রুপকে ঘিরে। গ্রুপটির বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ পরিকল্পিতভাবে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নাসা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার এবং তাঁর ভাই, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খোরশেদ আলম খন্দকারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের তীব্রতা থাকলেও অভিযুক্ত চক্রটির প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে সংশ্লিষ্ট অনেকেই পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি নিছক ব্যবসায়িক ব্যর্থতা নয়—বরং একটি সুশৃঙ্খল ‘শিকারী অবসায়ন’ (Predatory Liquidation)।
প্রথম পর্যায় : ব্যবসায়িক সংকট থেকে সুপরিকল্পিত লুটপাট
২০২৪ সালের অক্টোবরে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই গ্রুপটির ব্যবসায়িক ভাঙন শুরু হয়। চেয়ারম্যানের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ক্রেতারা কার্যত হাত গুটিয়ে নেন। দুইজন নিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করলেও মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অনুপস্থিত থাকায় ক্রেতাদের আস্থা ধসে পড়ে।
এই সময়েই অভিযোগ অনুযায়ী, ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করেন। শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোম্পানি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা না করে তিনি সচেতনভাবে অবসায়নের নামে লুটপাটের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়কালে নাসা গ্রুপের বাস্তব সম্পদ—সুতা কাপড় তৈরি পোশাকশিল্প যন্ত্রপাতি বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির এক সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“তিনি কোম্পানি বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেননি। কারখানায় তখন প্রকাশ্য গুজব ছিল—কম দামে পণ্য বিক্রি করে তিনি কমিশন হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।সেপ্টেম্বর নাগাদ চলমান সম্পদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেলে নজর পড়ে নাসা গ্রুপের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—এর জমি ও স্থাবর সম্পত্তির দিকে।
দ্বিতীয় পর্যায় : শ্রমিক অস্থিরতা ও সম্পত্তি বিক্রির ফাঁদ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পর্যায়ে ভাইস চেয়ারম্যান একটি দ্বিমুখী কৌশল নেন।
একদিকে, বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে ধর্মঘট ও অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়।
অন্যদিকে, সেই সংকটকে দেখিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রির পথ সুগম করার চেষ্টা চলে।
সূত্রের দাবি, প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের জমি ও সম্পত্তি মাত্র ২৫০ কোটি টাকায় বিক্রির জন্য আগেই ক্রেতা ঠিক করা ছিল।
এই লেনদেনের মাধ্যমে ভাইস চেয়ারম্যান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ চক্রের জন্য কয়েক কোটি টাকার কমিশন নিশ্চিত করা হয়।
তৃতীয় পর্যায় : আদালত কারসাজির গুরুতর অভিযোগ
যখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আদালত প্রাথমিকভাবে রায় দেন যে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি বিক্রির এখতিয়ার নেই, তখন অভিযোগ অনুযায়ী শুরু হয় আরও ভয়ংকর অধ্যায়।
ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার এবং তাঁর ভাই আইনজীবী খোরশেদ আলম খন্দকার আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
আইন অঙ্গনের একাধিক সূত্র খোরশেদ আলম খন্দকারের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
একজন কর্পোরেট অ্যাটর্নি বলেন,
“এটি কোনো ঋণ পুনঃতফসিল বা উদ্ধার প্রক্রিয়া নয়। এটি সরাসরি একটি সাজানো চুরি। সরকারি কর্মকর্তাদের অনিচ্ছাকৃতভাবে এই জালিয়াতির অংশ বানানো হচ্ছে।”
ভুক্তভোগী ৩০ হাজার শ্রমিক ও শতাধিক সরবরাহকারী
এই কথিত লুটপাটের সবচেয়ে বড় শিকার নাসা গ্রুপের ৩০ হাজার শ্রমিক। মাসের পর মাস তারা বেতন পাননি। সরকার শ্রমিকদের স্বার্থে যে ১৫০ কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছে, সেটি ফেরত পাওয়া নিয়েও গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
টেক্সটাইল সরবরাহকারীদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ।
একজন সরবরাহকারী বলেন,
“আমরা দুই বছরে ১২ কোটি টাকার কাপড় দিয়েছি। ২০২৪-এর মাঝামাঝি থেকে কোনো পেমেন্ট পাইনি। অথচ এখন শুনছি জমি অর্ধেক দামে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের টাকা তাহলে গেল কোথায়?”
বিশেষজ্ঞদের পাঁচ দফা সুপারিশ
এই সংকট থেকে উত্তরণে আইন ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন—
১️⃣ আদালত-নিযুক্ত স্বতন্ত্র প্রশাসক নিয়োগ
২️⃣ অক্টোবর ২০২৪ থেকে পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট
৩️⃣ স্বচ্ছ মূল্যায়ন ছাড়া সব সম্পত্তি বিক্রি স্থগিত
৪️⃣ বিচারিক ঘুষ ও দুর্নীতির ফৌজদারি তদন্ত
৫️⃣ ব্যাংক–সরবরাহকারী–শ্রমিকদের সমন্বয়ে ঋণদাতা কমিটি গঠন একজন কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ বলেন,
“কোম্পানি দেউলিয়া হতে পারে, কিন্তু তাকে খুন করা কোনো সমাধান নয়। এখানে যা ঘটছে, তা নিখাদ শিকারী অবসায়ন।”অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগ প্রসঙ্গে আইনজীবী খোরশেদ আলম খন্দকার বলেন,“আমি কখনোই নাসা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। এই সংকটে শ্রমিকদের জন্য কিছু করা যায় কি না—সেই চিন্তা থেকেই কাজ করছি। এর বাইরে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।”তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নাসা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।