নিজস্ব প্রতিবেদক :
মাদারীপুরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাগুলো এখন পরিবেশের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আবাদি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া এবং বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় পুড়ছে আশপাশের ফসল ও গাছপালা।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাহাড়, সংরক্ষিত এলাকা কিংবা লোকালয়ের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে,মাদারীপুরে অনেক অবৈধ ভাটা বসতবাড়ির গা ঘেঁষেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। অধিকাংশ ভাটারই নেই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স।
কৃষকদের অভিযোগ, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে ধানের ফলন কমে যাচ্ছে এবং আম-লিচুর মতো মৌসুমি ফলের মুকুল ঝরে পড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, “ভাটার মালিকরা জোর করে বা ফুসলিয়ে ফসলি জমির মাটি কিনে নিচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।”
ইট ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় বাতাসে কার্বন-মনোক্সাইড বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: আশপাশের মানুষের শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে।
জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: উচ্চ তাপমাত্রার কারণে মাটির অণুজীব মারা যাচ্ছে।
যথাযথ পদক্ষেপের দাবি
পরিবেশ সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কেবল জরিমানা নয়, বরং স্থায়ীভাবে এসব অবৈধ ভাটা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি মাটির ইটের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ‘ব্লক ইট’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, এবছরের অবৈধ ছাড়পত্র বিহীন ২টি ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করে আড়াই লক্ষ টাকা জরিমানা করেছি। ছাড়পত্র বিহীন বাকি ইটভাটা গুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকের সাথে সমান্নয় করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইনকে বৃদ্ধ আঙুল দেখিয়ে ছাড়পত্র ছাড়াই চালাচ্ছে ইটভাটা পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।
৫ আগস্টের পর থেকে সরকার পতনের পর বেশ কয়েকটি ইটভাটা বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ইটভাটাগুলোর কোনো ছাড়পত্র নেই। আইন অমান্য করে ছাড়পত্র ছাড়াই এসব ভাটা গুলো চালাচ্ছে।এছাড়া,ইটভাটার লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় নবায়নের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি আবেদন করেছেন। সেগুলো হলো মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাশকান্দি ইউনিয়নের বরহামগঞ্জ যাদুয়ারচর এলাকার জুয়েল খালাসীর মেসার্স পিবিএফ ব্রিকস, শিবচর উপজেলার কাঠালবাড়ী ইউনিয়নের কাঠালবাড়ী এলাকার মো. ইকবাল হোসেন শাহিনের মেসার্স জননী ব্রিকস, মাদারীপুর সদর উপজেলার রাস্তি ইউনিয়নের আরিফুর রহমান মোল্লার মেসার্স মোল্লা ব্রিকস-২।
ইটভাটা মালিকরা কোনো আইনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে। অনেকে ইটভাটার ভেতরে অবৈধ ভাবে স’মিল বসিয়ে কাঠ কেটে তা পোড়াচ্ছে। ফলে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বিলীন হচ্ছে নানা প্রজাতির গাছ। তাছাড়া কৃষি জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। আবার রাতের আধারে নদ-নদীর পাড় থেকে কৃষি জমির মাটি কাটায় ভাঙন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে স্থানীয়রা। সরকারি অনুমোদন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধভাবে এসব ইটভাটার কার্যক্রম চলে আসায় ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, গ্যাস ও ধুলায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন। তাছাড়া এসব ইটভাটার বেশির ভাগই স্থাপন করা হচ্ছে ফসলি জমিতে। মাদারীপুর সদর উপজেলার পাচখোলা ইউনিয়নে রয়েছে ৩৫ টির বেশি ইটভাটা।
পাচখোলা ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, শুধুমাত্র আমাদের এই পাচখোলা ইউনিয়নের রয়েছে ২৫/৩০টির মতো ইটভাটা। আগে ৩৫ টি ছিল। এখন বেশ কয়েকটি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র একটি ইউনিয়নে এতগুলো ইটভাটা কিভাবে থাকে, তা সত্যিই বোধগম্য নয়। এতে করে এই এলাকার বাসিন্দারা স্বাস্থ্য ঝুঁকি, পরিবেশ ও কৃষি জমি বিলুপ্তির পথে। এগুলোর ব্যাপারে সঠিক আইন প্রয়োগ করা দরকার।
এ বিষয় সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে- অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিগার সুলতানা বলেন, আমরা এখন নির্বাচনীয় কাজ নিয়ে ব্যবস্ততার মধ্যে আছি।এসময় অবৈধ ইটভাটা বা অন্য কোনো কাজের দিক দেখার সময় না-ই। তারপর ও আমরা গত মাসে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ ভাবে কাঠ পোড়ানোর দায়ে ২টি ইটভাটার মালিককে আড়াই লক্ষ টাকা জরিমানা করেছি। আপনার আমাদেরকে যে সকল ইটভাটা অবৈধ ও কাঠ পোড়ানো হচ্ছে একটি তালিকা দেন, আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।