স্টাফ রিপোর্টার:ফরিদগঞ্জ উপজেলার আষ্টা গ্রামে জমিতে জোরপূর্বক হালচাষের চেষ্টা এবং এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টা মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জমিতে হালচাষে বাধা দেওয়ায় ফরিদ হোসেন ও তাঁর মাকে মারধর করেন মনির হোসেন ও আজাদ পাটওয়ারী নামের দুই ভাই। পরে উল্টো অভিযোগ উঠেছে ফরিদসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন মনির হোসেন। অন্যদিকে, মনির হোসেন দাবি করেছেন, ফরিদ ও তাঁর লোকজন তাঁকে ছুরি দিয়ে কোপানোর চেষ্টা করেছেন। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে মনির ও আজাদকে মারধরের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী মামলার ২৫ দিন পার হলেও তদন্ত কর্মকর্তা উদ্ধার করেননি রক্তমাখা শার্ট ও ছুরি। জমিতে হালচাষকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত: স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ১২ ঘটিকায় মনির হোসেন ও আজাদ পাটওয়ারী একটি জমিতে জোরপূর্বক হালচাষের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় জমির দাবীদার ফরিদ হোসেন বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে মনির ও আজাদ ফরিদকে বেদম মারধর করেন। চিৎকার শুনে পার্শ্ববর্তী বাড়ি থেকে দৌড়ে যান ফরিদের মা ও অন্যান্যরা। এ সময় ফরিদের মা ছামছুন নাহার (৬১)কে মারধর করা হয়। সে সময় ফরিদের শরীরের অংশ জমির কাদায় ডেবে ছিলো। এক পর্যায়ে, আপনজনেরা গুরুতর আহত অবস্থায় ফরিদকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রদীপ সরকারের ফার্মেসীতে নেন। তিনি পালস মেপে বলেন,উনাকে দ্রুত চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সদরের চিকিৎসক তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখেন ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। পরে তিনি প্রায় পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ফরিদের মা-ও প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে। তবে মনির ও আজাদ পাটওয়ারী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা ফরিদ ও তাঁর মাকে কোনো প্রকার মারধর করেননি। ঘটনাস্থলে না থেকেও মামলায় বৃদ্ধ চাচা: অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাত ঘটিকায় বাড়ি থেকে বের হয়ে ফরিদের চাচা ফখরুল ইসলাম মিজান (৬১) কামতা বাজার যান। সেখান থেকে চাঁদপুর সদরে কোর্ট এলাকায় একজন আইনজীবীর চেম্বারে অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি চাঁদপুর থেকে বাড়ি ফেরেন ওইদিন বিকালে। এরপরও তাঁকে মামলায় আসামি করা হয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে পুলিশ বাড়িতে গিয়ে ওই বৃদ্ধকে আটক করে আদালতে পাঠায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ঘটনার আগের দিন ফরিদের ওই চাচাকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা একজন পার্শ্ববর্তী মাছচাষি কলমতর বেপারি (৫৮) প্রত্যক্ষ করেছেন বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়ির সামনের রাস্তায় দিয়ে ২৪ আগস্ট সকালে যাওয়ার সময় ফখরুল ইসলাম মিজানের গতিরোধ করে মনির পাটওয়ারী বলেন, “কাইল জমিতে নামলে হোগার গাদি হাডাই হালাইয়াম”। আমি পুকুরে যাওয়ার পথে এ কথা শুনেছি।
চিৎকার শুনেছেন মসজিদের ইমাম: পাশের মসজিদের ইমাম জানান, ঘটনার সময় জমিতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা তিনি দেখেননি। তবে তিনি চিৎকার শুনেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফরিদের মা ভেজা কাপড়ে হন্তদন্ত হয়ে মসজিদের কাছে এসে ফরিদকে পানি পান করানোর জন্য তাঁর কাছ থেকে পানি নেন। ওই ইমাম আরও জানান, তিনি জমিতে একটি হালচাষের ট্রাক্টর দেখেছিলেন। এদিকে, ইমাম যদিও বলেছেন, তিনি দেখেননি। অথচ, ঘটনার সময় আহত ফরিদকে তার মা ছামছুন নাহার, চাচা দেলোয়ার হোসেন (৫৮), চাচী আয়েশা আক্তার (৪৮) জেঠি দিলারা বেগম (৬৬)’র সঙ্গে জমি থেকে ইমামসহ উদ্ধার করেছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় ফরিদকে হাসপাতালে নেওয়ার দাবি:
আষ্টা বাজারের ফার্মেসি ব্যবসায়ী গৌতম জানান, ফরিদকে একটি সিএনজিতে নিয়ে ফরিদের মা, জোসনা ও সায়েম নামের তিনজন আমার ফার্মেসীতে আসেন। ফরিদ “বুক ফাটি যায়” বলে চিৎকার করছিলো। পালস মেপে ৮০ বাই ১৪০ দেখে স্বজনদের বলি দ্রুত চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। মনিরের হাতে ‘কোপের’ চিহ্ন নিয়ে প্রশ্ন: অন্যদিকে, মনির হোসেন দাবি করেছেন, ফরিদ ও তাঁর লোকজন তাঁকে ছুরি দিয়ে কোপানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, হাত দিয়ে ঠেকানোর সময় তাঁর বাহুতে কেটে যায় এবং সেখানে দুটি সেলাই দেওয়া হয়েছে। আজাদ পাটওয়ারীর দাবি, তাঁর ভাই মনির হাত দিয়ে কোপ ঠেকানোয় প্রাণে বেঁচেছেন। তাঁর ভাষ্য, কোপটি করা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশ্যে। তবে কী ধরনের অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়া হয়েছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁরা ছুরির কথা বলেন। ছুরি দিয়ে কোপানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। মনির হোসেন আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় তাঁর পরনে হাতাওয়ালা শার্ট ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোপের আঘাতে শার্টের হাতাও কেটে যায়। কিন্তু ওই শার্টটি দেখাতে বলা হলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। শার্টটি পুলিশ জব্দ করেছে কি না, এ বিষয়েও তিনি সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর চিকিৎসা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন: ঘটনার পর দুপুরের পর থেকেই মনির হোসেন থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা গেছে। তবে ওই দিন রাত ১১টা ২০ ঘটিকায় তিনি ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে গিয়ে বাহুতে কাটা দাগ দেখিয়ে চিকিৎসা নেন। সেখানে তাঁর হাতে দুটি সেলাই দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এখানেই দেখা দিয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: সংঘর্ষের সময় যদি তাঁর হাতে গুরুতরভাবে কোপ লাগে, তাহলে তিনি কেন প্রায় ১২ ঘণ্টা পর চিকিৎসা নিলেন? এই দীর্ঘ সময় তিনি কীভাবে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে রাখলেন? ঘটনার পরপরই তিনি কি পুলিশের কাছে আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন? তাঁর পরনের কথিত কাটা শার্টটি ও ছুরি পুলিশ জব্দ করেছে কি না? চিকিৎসার সময় পাওয়া আঘাতের সঙ্গে তাঁর করা মামলার অভিযোগের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না? এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে জানা গেছে। আপনি ব্যবহৃত ছুরি ও রক্তমাখা শার্ট উদ্ধার করেছেন কি না, এ প্রশ্নে বলেন (গতকাল শনিবার) ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯ ঘটিকায় বলেন, “না, ছুরি ও শার্ট এখনও উদ্ধার করিনি”। পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে প্রকৃত ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা: মনির হোসেন ও আজাদ পাটওয়ারী ফরিদ ও তাঁর মাকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, বরং ফরিদ পক্ষই মনিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরি দিয়ে কোপানোর চেষ্টা করেছে।অন্যদিকে, ফরিদ পক্ষের দাবি, জমিতে জোরপূর্বক হালচাষে বাধা দেওয়ায় তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং পরে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে মনির হোসেন উল্টো মামলা করেন। দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, মনিরের চিকিৎসা নিতে বিলম্ব, কথিত কাটা শার্টের সন্ধান না পাওয়া এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, সব মিলিয়ে প্রকৃত ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এখন প্রশ্ন হলো, জমিতে হালচাষে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে আসলে কী ঘটেছিল? কে আগে হামলা চালিয়েছিল? মনির হোসেনের আঘাতের প্রকৃতি ও চিকিৎসা নেওয়ার সময়ের মধ্যে যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেছেন মনির হোসেন ২৫ তারিখ রাত ১১:২০ ঘটিকায় জরুরী বিভাগে এসে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। যদিও, কাটার ধরন ও সময় সম্পর্কে উত্তর পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাকিবুল বলেছেন, অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, মামলার এক নম্বর আসামী ফখরুল ইসলাম মিজান যদি ঘটনাস্থলে না থাকেন সেটা তদন্তক্রমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ফখরুল ইসলাম মিজান একজন সিনিয়র সিটিজেন। তাকে রাত দুই ঘটিকায় গ্রেফতার করাই লাগে। এমন প্রশ্নে তিনি বলেছেন, এজাহার নামীয় আসামীকে গ্রেফতার করা যায়।