গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি:ফয়জুল ইসলাম লিমন : গোপালগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এসএম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ভর্তি নীতিমালা উপেক্ষা করে ডিজিটাল লটারি ও নির্ধারিত অপেক্ষমাণ তালিকার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং ভর্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ ও সহকারী শিক্ষক মো. মুজাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন রেশমা আক্তার নামের এক অভিভাবক।
অভিযোগকারীর দাবি, তাঁর ছেলেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সহকারী শিক্ষক মো. মুজাহিদুল ইসলাম প্রথমে এক লাখ টাকা নেন। পরে প্রধান শিক্ষককে দেওয়ার কথা বলে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীকে দুই দিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সুযোগ দেওয়ার পর জেলা প্রশাসকের নিষেধাজ্ঞার কথা বলে ক্লাস করতে নিষেধ করা হয়। এরপর টাকা ফেরত চাইলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ‘ম্যানেজ’ করার অজুহাতে টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে অর্থ লেনদেন ও ঘুষ গ্রহণের এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এ প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
লটারি ও অপেক্ষমাণ তালিকার বাইরে ভর্তির অভিযোগ
অভিযোগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ষষ্ঠ শ্রেণির দিবা শাখায় আব্দুর রহমান (রোল-৩৩৭) এবং প্রভাতী শাখায় ইস্তিয়াক হোসাইন (রোল-৩৩৫) ভর্তি হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রভাতী শাখায় মাহিন হাওলাদার (রোল-২৫৫) এবং এপ্রিল মাসে সৌহার্দ্য ভাদুড়ি (রোল-২৫৭) ভর্তি হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, এসব ভর্তি নির্ধারিত ডিজিটাল লটারি, মেধাতালিকা ও অপেক্ষমাণ তালিকার বাইরে সম্পন্ন হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভর্তির নথি, অনুমোদনপত্র এবং সরকারি তালিকা যাচাই করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। সে ক্ষেত্রে তালিকার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকলে, কোন বিধি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে তা করা হয়েছে, সেটি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
অন্যান্য শ্রেণিতেও অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগকারী অভিভাবক ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির দাবি, শুধু ষষ্ঠ শ্রেণি নয়, বিদ্যালয়ের অন্যান্য শ্রেণিতেও অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের অভিযোগ, লটারিতে সুযোগ না পাওয়া কিছু অভিভাবকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর একটি অনিয়মিত প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।
তবে অন্যান্য শ্রেণিতে অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া না গেলে এসব দাবিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি নির্ধারণে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত।অনিয়মের কথা স্বীকার, অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার প্রধান শিক্ষকের নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ ভর্তির ঘটনা স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার সুপারিশে ওই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। তবে ভর্তির ক্ষেত্রে কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ভর্তি কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসককে না জানিয়ে কীভাবে এসব ভর্তি সম্পন্ন করা হলো, সে বিষয়ে প্রধান শিক্ষক সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী, সুপারিশের ভিত্তিতে ভর্তি হলেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভর্তি-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অর্থ লেনদেনের দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।তদন্তের আশ্বাস জেলা প্রশাসকের এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও ভর্তি কমিটির সভাপতি মো. আরিফ উজ জামান বলেন, “একজন অভিভাবকের অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ শুধু সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সরকারি ভর্তি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সাধারণ মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। বিশেষ করে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকলে, তার বাইরে কোনো ভর্তি সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তা বিধিসম্মত ছিল কি না—সেটি যাচাই করা জরুরি।এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট বছরের ভর্তি তালিকা ও অনুমোদনপত্র যাচাই, অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অনুসন্ধান এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রতিটি ভর্তির অনুমোদন ও নথি সংরক্ষণ এবং অভিভাবকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এখন নজর জেলা প্রশাসনের তদন্তের দিকে। অভিযোগের সত্যতা কতটুকু, কারা জড়িত এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোনো বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না—তদন্তেই তা স্পষ্ট হবে।